Idealism : ভাববাদ কাকে বলে | ভাববাদের মূলনীতি ও শিক্ষায় প্রভাব

ভাববাদ (Idealism) হল ভাবের জগৎ বা আধ্যাত্মিক জগৎ। এই ভাবজগৎ হল ব্রহ্মসত্ত্বা। তাই যে তত্ত্ব ভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তাকে বলে ভাববাদ।

ভাববাদে বিশ্বাসী, দার্শনিকেরা মনে করেন মানুষ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক ভাবমূলক সত্তার অংশ। তাই ভাববাদে আধ্যাত্মিকতা বা ঈশ্বর উপলব্ধিকে প্রধান উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। মানুষের জগৎ দুই ধরনের একটি হল বস্তুজগৎ ও অপবর্তীয় হল ভাবজগত। ভাববাদদের মত অনুসারে, আত্মা বা ভাবের জগত ইন্দ্রিয়াতীত। অর্থাৎ মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এটি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

ভাববাদ কাকে বলে (Idealism)

ইংরেজি ‘Idealism’ শব্দটি ‘Idea’ ও ‘ism’ থেকে এসেছে যার অর্থ হল যথাক্রমে – ভাব বা ধারণা এবং তত্ত্ব বা মতবাদ। এখানে ইংরেজি ‘l’ বা ‘এল’ অক্ষরটি অলংকরনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

ভাববাদ হল পাশ্চাত্য দর্শনের একটি অন্যতম শাখা। এই দর্শনে মতাদর্শে বিশ্বাসী দার্শনিকগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – প্লেটো, কমোনিয়াস, পেস্তালতসি, ফ্রয়েবেল, গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দ প্রমুখ।

যে মতবাদ অনুযায়ী ভাববাদ বা আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য বজায় রাখা হয় তাকে বলা হয় ভাববাদ।

ভাববাদের সংজ্ঞা (Definition of Idealism)

Idealism
Idealism in Education

বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাববাদ কে ব্যাখ্যা করেছে। এখানে ভাববাদী দার্শনিকগণের দেওয়া কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হল –

বিখ্যাত দার্শনিক J.S. Ross বলেছেন – “Idealistic philosophy takes many and varied forms, but the postulate underlying all this is that mind of spirit is the essential world stuff, that the true reality is of a mental character.”

গ্রীক দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, ভাববাদ হল – “ভাবের জগতে সত্যের অধিষ্ঠান”।

ভাববাদের মূলনীতি (Principle of Idealism)

ভাববাদী দার্শনিকগণ আধ্যাত্বিক সত্ত্বায় বিশ্বাসী। ভাববাদের মূল নীতিগুলি হল নিম্নলিখিত –

i) ভাববাদী দর্শন আধ্যাত্মিক সত্তায় বিশ্বাসী। তাই এটি ‘আধ্যাত্মবাদী’ দর্শন।

ii) ভাববাদের প্রধান লক্ষ্য হল মুক্তি লাভ বা মোক্ষলাভ।

iii) ভাববাদী দর্শন ঈশ্বর বিশ্বাসী। অর্থাৎ এই দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়ে থাকে।

iv) ভাববাদী দর্শনের অন্যতম নীতি হল এই দর্শন বস্তু জগতকে স্বীকার করে না। অর্থাৎ ভাববাদীদের মতে দৃশ্যমান জগত সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভ্রমে ভরা।

v) ভাববাদী দর্শন আত্ম উপলব্ধিমূলক প্রকৃতির।

vi) ভাববাদী দর্শন ভাবের জগতকে কেন্দ্র করে গঠিত।

vii) এই দর্শন অনুযায়ী পার্থিব জগৎ মিথ্যা।

viii) ভাববাদী দর্শনে মূলনীতি হল আত্মা অবিনশ্বর। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু হলেও আত্মা হল অবিনশ্বর ও সত্য।

ix) এই দর্শন অনুযায়ী মানুষ আধ্যাত্মিক সত্তার অধিকারী।

x) ভাববাদী দর্শনে মূল্যবোধ হল পূর্ব অর্জিত। অর্থাৎ মূল্যবোধ অভ্যন্তরীণ ও অপরিবর্তনীয় প্রকৃতির।

ভাববাদের শিক্ষায় প্রভাব (Importance of Idealism in Education)

ভাবাদের আদর্শগুলি বা নীতিগুলি কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক ও মনোজগতকে বিকশিত করে তা নয়, এটি শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

শিক্ষাক্ষেত্রে ভাববাদ যে সমস্ত দিক থেকে প্রভাব বিস্তার করে থাকে, সেগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল –

1. ভাববাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য (Idealism and Aims of Education)

ভাববাদী দার্শনিকগণ শিক্ষার লক্ষ্য হিসাবে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাই ভাববাদী দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ‘শিক্ষা হল শিশুর অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করা’।

তাই ভাববাদী দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্যগুলি হল –

  • আত্ম উপলব্ধি হল শিক্ষা।
  • সুস্থ দেহে সুস্থ মন গড়ে তোলা।
  • ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন বা বিকাশ সাধন।
  • শিশুর অন্তর্নিহিত সত্তা পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন।
  • শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার বিকাশ সাধন।
  • শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক বিকাশ সাধন করা প্রভৃতি।

2. ভাববাদ ও শিক্ষার পাঠক্রম (Idealism and Curriculum)

ভাববাদী দার্শনিক অনুযায়ী জীবনের লক্ষ্য হল সত্য, শিব ও সুন্দরের উপাসনা করা। তাই ভাববাদ অনুযায়ী শিক্ষার পাঠক্রমের মধ্যে থাকবে আধ্যাত্মিককতার বিকাশের জন্য যাবতীয় পাঠক্রম।

ভাববাদ অনুযায়ী শিক্ষার পাঠক্রম হবে –

  • শরীর চর্চামূলক পাঠক্রম – স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, শরীরচর্চামূলক ব্যায়াম প্রভৃতি
  • বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য পাঠক্রম – এই পাঠক্রমের মধ্যে অংক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি।
  • নৈতিক বিকাশ – নৈতিক বিকাশের পাঠক্রমের মধ্যে ধর্মশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয় থাকবে।

3. ভাববাদ ও শিক্ষাদান পদ্ধতি (Idealism and Teaching Method)

ভাববাদ অনুযায়ী শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে বিজ্ঞানসম্মত। শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক ফ্রয়েবেল শিক্ষাকে খেলাভিত্তিক করার কথা বলেছেন। তাই ভাববাদ অনুযায়ী শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে স্বাধীন প্রকৃতির এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ বা অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন সম্ভব হবে।

ভাববাদী দর্শন অনুযায়ী শিক্ষাদান পদ্ধতি হল –

  • প্রশ্ন উত্তর পদ্ধতি,
  • বক্তৃতা পদ্ধতি,
  • সক্রেটিস পদ্ধতি,
  • আলোচনা পদ্ধতি,
  • বিতর্ক পদ্ধতি,
  • গল্পকথন ও অনুকরণ প্রভৃতি।

4. ভাববাদ ও শৃঙ্খলা (Idealism and Discipline)

ভাববাদ অনুযায়ী শৃঙ্খলা হবে কঠোর প্রকৃতির। অর্থাৎ শৃঙ্খলা হবে আত্মশৃঙ্খল। কারণ ভাববাদী দার্শনিকগণ মনে করেন শিশুর মনকে কঠোর শৃঙ্খলায় না বাঁধলে সে অশৃংখল বা বিশৃঙ্খল আচরণ করতে পারে।

অর্থাৎ শিশুর অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন সম্ভবপর হবে না। তাই তারা শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন।

ভাববাদের সীমাবদ্ধতা (Demerits of Idealism in Education)

শিক্ষা ক্ষেত্রে ভাববাদী দর্শনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভাববাদের সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –

i) আধ্যাত্মিক জ্ঞানের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ,

ii) বাস্তবসম্মত শিক্ষার অভাব,

iii) ব্যবহারিক শিক্ষা অবহেলিত,

iv) তাত্তিক জ্ঞানের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ,

v) জাগতিক বা প্রাকৃতিক জগতকে অস্বীকার প্রভৃতি।

তথ্যসূত্র (References)

  • Aggarwal, J. C., Theory and Principles of Education. 13th Ed. Vikas Publishing House Pvt. Ltd.
  • V.R. Taneja, Educational Thoughts & Practice. Sterling Publication Pvt. Ltd. New Delhi
  • Nayak, B.K, Text Book of Foundation of Education. Cuttack, Odisha: KitabMhal
  • Ravi, S. Samuel, A Comprehensive Study of Education, Fourth Printing-May 2016, Delhi – 110092, ISBN – 978-81-203-4182-1,
  • Internet sources

প্রশ্ন – আধুনিক দর্শনের জনক কে?

উত্তর – আধুনিক দর্শনের জনক হলেন বিশিষ্ট দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ্‌ সক্রেটিস।

প্রশ্ন – ভাববাদী দার্শনিকের নাম লেখো।

উত্তর – ভাববাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী দার্শনিকগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – প্লেটো, কমোনিয়াস, পেস্তালতসি, ফ্রয়েবেল, গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দ প্রমুখ।

প্রশ্ন – ভাববাদী শিক্ষা দর্শনের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর – ভাববাদী শিক্ষা দর্শনের বৈশিষ্ট্য হল – 1. ভাববাদী দর্শন আত্ম উপলব্ধিমূলক প্রকৃতির, ও 2. ভাববাদী দর্শন ভাবের জগতকে কেন্দ্র করে গঠিত।

প্রশ্ন – দুজন ভাববাদী দার্শনিক এর নাম লেখো।

উত্তর – দুজন ভাববাদী দার্শনিক এর নাম হল – প্লেটো ও কমোনিয়াস।

প্রশ্ন – আধুনিক শিক্ষার জনক কে?

উত্তর – কোমেনিয়াসকে আধুনিক শিক্ষার জনক বলা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন – ভাববাদ কি?

উত্তর – যে মতবাদ ভাবের জগত বা আধ্যাত্মিক জগতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তাকে বলে ভাববাদ। এই ভাববাদ অনুযায়ী সমস্ত কিছু আধ্যাত্মিক সত্তা বর্তমান। তাই ভাববাদী দার্শনিকগণ ঈশ্বরের বিশ্বাস করে থাকেন।

আরোও পড়ুন

2 thoughts on “Idealism : ভাববাদ কাকে বলে | ভাববাদের মূলনীতি ও শিক্ষায় প্রভাব”

Leave a Comment

close