Share on WhatsApp Share on Telegram

রুশোর শিক্ষা চিন্তা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও | Contribution of Rousseau in Education

যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মনীষী ও শিক্ষাবিদের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু যার আবির্ভাবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় তিনি হলেন রুশো। তাই রুশোর শিক্ষা চিন্তা (Contribution of Rousseau in Education) সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিল।

সামাজিক অস্থিরতা যুগে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীতে 1712 সালে জেনেভা শহরে রুশো জন্ম গ্রহন করেন। রুশোর পুরো নাম ছিল জ্যাঁ জ্যাকস্‌ রুশো (Jean Jacqes Rousseau)। জন্মের পর রুশো তার মাতাকে হারান। তাই তার শৈশব সংবেদনশীল হিসেবে গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে রুশ ও প্যারিস শহরে চলে আসেন। অন্যান্য বহু পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর 38 বছর বয়সে তিনি একজন লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল – এমিল (Emile -1762) এবং The Social Contract (1762)। 1778 খ্রিস্টাব্দে দার্শনিক, সমাজবিদ ও শিক্ষাবিদ রুশো প্রয়াত হন।

রুশোর জীবন দর্শন

রুশোর জীবন দর্শন প্রকৃতিবাদ দ্বারা প্রভাবিত। তাই রুশোর শিক্ষা দর্শন বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়। যথা – i) প্রাকৃতিক মানুষ, ii) প্রাকৃতিক সভ্যতা এবং iii) প্রাকৃতিক রাষ্ট্র

এমিল গ্রন্থে রুশো প্রকৃতিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা – জাগতিক প্রকৃতি, জৈবিক প্রকৃতি এবং মানসিক প্রকৃতি।

তাই রুশোর জীবন দর্শন প্রকৃতিবাদ এর উপর সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত। তিনি বলেন – শিশুকে একাকী থাকতে দাও তাকে তথাকথিত সভ্য মানুষ হওয়ার চেয়ে প্রাকৃতিক মানুষ হতে দাও।

রুশোর শিক্ষা চিন্তা | Contribution of Rousseau in Education

রুশো ছিলেন শিশু কেন্দ্রিক শিক্ষার জনক। রুশোর শিক্ষা চিন্তা রুশোর জীবন দর্শন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। তাই রুশোর শিক্ষা চিন্তা প্রকৃতি কেন্দ্রিক প্রকৃতির। রুশোর শিক্ষা চিন্তা বিশ্লেষণ করলে যে সমস্ত দিক পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –

1. শিক্ষার লক্ষ্য

রুশো প্রকৃতি অনুযায়ী শিক্ষাদানের কথা বলেছিলেন। তাই তিনি বলেন – শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহ বা জ্ঞানের জন্য, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া কোন বিষয় নয়। শিক্ষা হলো শিশুর স্বাভাবিক ক্ষমতা ও সামর্থ্যের বিকাশ সাধন।

রুশোর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল শিশুর স্বাভাবিক সম্ভাবনার বিকাশ সাধন করা। তার মতে – শিক্ষার লক্ষ্য হল শিশুর দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, জন্মগত প্রবণতা ও সামর্থের বিকাশ সাধন।

এমিল গ্রন্থে শিক্ষা সম্পর্কে কিছু বলেন – ‘ভবিষ্যৎ জীবন যাপনে নিরিখে শিশু একজন সৈন্য, জেলাশাসক হওয়ার আগে তার মানসিক গুন সম্পন্ন প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠা উচিত’।

2. শিক্ষার পাঠক্রম

রুশো বলেন শিক্ষার পাঠক্রম হবে শিক্ষার লক্ষ্য অনুযায়ী। অর্থাৎ তিনি শিশুর জীবন বিকাশের স্তর ক্ষেত্রে স্তর ভিত্তিক পাঠক্রমের কথা উল্লেখ করেছেন। নির্দিষ্ট কোনো পাঠক্রমের কথা বলেনি। তিনি শিশুর আগ্রহ,চাহিদা, ক্ষমতা প্রভৃতি অনুযায়ী পাঠক্রম নির্বাচনের কথা বলেছেন।

রুশোর মতানুযায়ী আনন্দ, স্বাধীনতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা অনুযায়ী শিশুকে শিক্ষা দিতে হবে। তাছাড়া শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং কেন্দ্রীয় সুগঠিত করে তোলার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশে দৈহিক অনুশীলন পাঠক্রমের বিষয়বস্তু হবে।

3. শিক্ষণ পদ্ধতি

রুশো সমাজে প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। তিনি শিশুকে স্বাধীনভাবে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন। অর্থাৎ রুশো শিশুর প্রকৃতি অনুযায়ী সহজ-সরল এবং অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন।

শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসেবে রুশো আবিষ্কার, পর্যবেক্ষণ, ও সমন্বয় পদ্ধতি প্রভৃতির কথা বলেন। এছাড়া শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে খেলাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন।

4. শিক্ষকের ভূমিকা

রুশোর মতে – শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং সহায়ক। শিক্ষকের ভূমিকা হবে গৌণ প্রকৃতির। অর্থাৎ শিক্ষক বাইরে থেকে কোনো বিষয় শিশুর উপর চাপিয়ে দেবেন না। তিনি কেবলমাত্র শিশুকে বন্ধুর মতো বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করবেন।

তাই রুশো বলেন – শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিকাশের পথকে বাতাস সৃষ্টি করবেন না। তার ভূমিকা হবে নিরন্তর বিকাশের পথে এগিয়ে চলতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

5. শৃঙ্খলা

রুশো কঠোর শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেন – জন্ম মুহুর্তে মানুষ স্বাধীন। কিন্তু পরবর্তীকালে সে সর্বত্র শৃংখলে আবদ্ধ হয়। তাই তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুকে মুক্ত শৃঙ্খলা দানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

6. নারী শিক্ষা

নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে রুশোর দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়। তিনি নারী শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তার রচিত এমিল গ্রন্থে এমিলের জীবনসঙ্গী সোফিয়ার শিক্ষাদানের কথা বলেছেন।

রুশো বলেন – মেয়েদের বৌদ্ধিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারা গৃহস্থলীর নানা শিক্ষা গ্রহণ করবে। যেমন – রন্ধন, সেলাই, ঘর সাজানো প্রভৃতি।

7. ইতিবাচক ও নেতিবাচক শিক্ষা

রুশোর শিক্ষা চিন্তার একটি অন্যতম দিক হল ইতিবাচক শিক্ষা ও নেতিবাচক শিক্ষা পদ্ধতি।

i) ইতিবাচক শিক্ষা – রুশো গতানুগতিক প্রথা অনুযায়ী পদার্থ শৈশবে বা বাল্যকালের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইতিবাচক শিক্ষা হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেন ইতিবাচক শিক্ষা বিভিন্ন ধরনের উপদেশ, তথ্য, তত্ত্ব এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার শিক্ষা। যেটি শিশু মনকে অপরিপক্ক করে গড়ে তোলে।

ii) নেতিবাচক শিক্ষা – রুশো ইতিবাচক শিক্ষার পরিবর্তে নেতিবাচক শিক্ষার দানের কথা বলেছেন। রুশোর মতে – নেতিবাচক শিক্ষা মানে না পড়ানো নয় বা শিক্ষাদান নয়।

রুশোর মতে – নেতিবাচক শিক্ষা হল যে শিক্ষা শৈশবে বাচনিক হবে না। শিশু কেবলমাত্র নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবেশ থেকে পর্যবেক্ষণ ও অজানা বিষয় সম্পর্কে পরিচিতি করণের মাধ্যমে শিখবে।

তাই রুশো বলেছেন – নেতিবাচক শিক্ষার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রদান করার আগে শিশুদের জ্ঞান আহরণের সঙ্গে যুক্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করতে পারে।

উপসংহার (Conclusion)

সর্বোপরি বলা যায়, রুশোর শিক্ষা চিন্তা (Contribution of Rousseau in Education) শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তাই রুশোকে আধুনিক শিক্ষা সহ শিশু কেন্দ্রিক শিক্ষার জনক বলা হয়ে থাকে। বাইরে থেকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে রুশো সম্পূর্ণ নতুন এক শিক্ষা ব্যবস্থার ধারণা প্রদান করেন। যেটি শিক্ষা ক্ষেত্রে শিশু মুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

কিছু সমালোচনা থাকলেও রুশোর শিক্ষাভাবনা বা শিক্ষা চিন্তা বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার প্রবর্তিত শিশু কেন্দ্রিক শিক্ষা আধুনিক শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। তাই রুশোর শিক্ষা চিন্তা ছিল সম্পূর্ণ মনোবিজ্ঞানসম্মত এবং আধুনিক প্রকৃতির।

তথ্যসূত্র (References)

  • Ravi, S. Samuel, A Comprehensive Study of Education, Fourth Printing-May 2016, Delhi – 110092, ISBN – 978-81-203-4182-1
  • Education in India-Past-Present-Future, Vol. I and II, J. P. Banerjee
  • Landmarks in the History of Modern Indian Education, J. C. Aggarwal
  • Internet Sources

প্রশ্ন – শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক কাকে বলা হয়

উত্তর – শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক বলা হয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রুশোকে।

প্রশ্ন – রুশোর লেখা বিখ্যাত শিক্ষামূলক গ্রন্থটির নাম লেখো।

উত্তর – রুশোর লেখা বিখ্যাত শিক্ষামূলক গ্রন্থটির নাম হল – এমিল (1762).

প্রশ্ন – ‘Emile’ চরিত্রটি কোন বিখ্যাত দার্শনিকের সৃষ্টি

উত্তর – ‘Emile’ চরিত্রটি রুশো নামক বিখ্যাত দার্শনিকের সৃষ্টি।

প্রশ্ন – রুশোর মতে শিক্ষার স্তরগুলি কী কী

উত্তর – শিক্ষাবিদ রুশো শিক্ষার স্তরকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। রুশোর মতে শিক্ষার স্তরগুলি হল –
i) শৈশবকাল (জন্ম থেকে 5 বছর),
ii) বাল্যকাল (5 থেকে 12 বছর)
iii) কৈশোর কাল (12 থেকে 15 বছর)
iv) যৌবনকাল বা পরবর্তী পর্যায় (15 থেকে 24 বছর)

প্রশ্ন – নেতিবাচক শিক্ষা কি

উত্তর – শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসেবে ইতিবাচক ও নেতিবাচক এই দুই ধরনের শিক্ষার কথা বলেছেন। রুশো ইতিবাচক শিক্ষার পরিবর্তে নেতিবাচক শিক্ষার দানের কথা বলেছেন। রুশোর মতে – নেতিবাচক শিক্ষা মানে না পড়ানো নয় বা শিক্ষাদান নয়। রুশোর মতে – নেতিবাচক শিক্ষা হল যে শিক্ষা শৈশবে বাচনিক হবে না। শিশু কেবলমাত্র নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবেশ থেকে পর্যবেক্ষণ ও অজানা বিষয় সম্পর্কে পরিচিতি করণের মাধ্যমে শিখবে।

আরোও পড়ুন

Mr. Debkumar – Author and Founder of Edutiips.com

Mr. Debkumar – Author and Founder of Edutiips.com

A committed teacher with more than ten years of teaching experience at a general degree college, focused on academic excellence and the overall development of students.

1 thought on “রুশোর শিক্ষা চিন্তা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও | Contribution of Rousseau in Education”

Leave a Comment

close