সমাজে কোনো ব্যক্তির সামাজিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে বা পরিবর্তনশীলতার ক্ষেত্রে সংস্কৃতায়ন (Sanskritization in Sociology) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়।
সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ভারতীয় সমাজে বিশেষ করে জাতি বা সামাজিক গোষ্ঠীগুলির সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে এই ধারণার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভারতীয় সমাজের সামাজিক পরিবর্তন, জাতিভেদ ব্যবস্থা এবং সামাজিক গতিশীলতা বিশ্লেষণে সংস্কৃতায়ন একটি উল্লেখযোগ্য ধারণা।
সংস্কৃতায়ন কাকে বলে | Sanskritization in Sociology
ভারতীয় সমাজে সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশিষ্ট ভারতীয় সমাজতত্ত্ববিদ অধ্যাপক শ্রীনিবাস সংস্কৃতায়ন শব্দটি সর্বপ্রথম প্রচলিত করেন। এই শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে সামাজিক গতিশীলতা বর্ণনা করার জন্য।
অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞানী এম. এন. শ্রীনিবাস (M. N. Srinivas) ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Sanskritization ধারণাটিকে বিশেষভাবে বিকশিত করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, কোনো নিম্ন বা মধ্যবর্তী সামাজিক গোষ্ঠী উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর আচরণ ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে।
সংস্কৃতায়ন সম্পর্কে অধ্যাপক শ্রীনিবাস তাঁর “Social Change In Modern India” গ্রন্থে বলেছেন – সংস্কৃতায়ন হল সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে নিচু জাতির হিন্দুরা বা অন্যান্য জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে নিজেদের জীবনযাত্রা প্রণালী, রীতিনীতি ইত্যাদি পরিবর্তন করে উচ্চ জাতির হওয়ার সমান হওয়ার চেষ্টা করে।
সংস্কৃতায়নের মাধ্যমে সমাজের ব্যক্তিদের যে পরিবর্তন সূচিত হয়, সেটির মাধ্যমে সামাজিক সচলতা সংগঠিত হয়। অধ্যাপক শ্রীনিবাস প্রথমে এই প্রক্রিয়াকে ব্রাহ্মণ্যকরণ আখ্যা দিলেও পরবর্তীকালে একে সংস্কৃতায়ন হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ তিনি বলেন – এখানে বিভিন্ন বর্ণের মানুষেরা তাদের পূর্ব পরিচয়, নিয়ম, প্রথা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পরিবর্তন সাধন করে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর অনুসরণ করে থাকে।
- সংস্কৃতায়ন = উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আচরণ অনুসরণ + সামাজিক মর্যাদা উন্নত করার প্রচেষ্টা।
সংস্কৃতায়ন এর বৈশিষ্ট্য | Characteristics Sanskritization in Sociology
সংস্কৃতায়ন সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সমাজের মানুষদের এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে বা এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে গতিশীলতা লাভ করতে সহায়তা করে। সংস্কৃতায়নের বৈশিষ্ট্য যে সমস্ত দিক থেকে পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল –
সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত
সংস্কৃতায়নের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। অপেক্ষাকৃত নিম্ন মর্যাদার কোনো গোষ্ঠী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন গোষ্ঠীর আচরণ অনুসরণ করে নিজেদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করার চেষ্টা করতে পারে।
উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর অনুকরণ
এই প্রক্রিয়ায় কোনো গোষ্ঠী সাধারণত এমন একটি গোষ্ঠীর জীবনধারা ও রীতিনীতি অনুসরণ করে, যাকে স্থানীয় সমাজে তুলনামূলকভাবে উচ্চ মর্যাদার বলে মনে করা হয়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
সংস্কৃতায়নের ফলে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোনো গোষ্ঠী সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট খাদ্য পরিহার করতে পারে অথবা অপেক্ষাকৃত উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর প্রচলিত খাদ্যসংক্রান্ত রীতিনীতি গ্রহণ করতে পারে।
ধর্মীয় আচার ও প্রথার পরিবর্তন
সংস্কৃতায়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার, পূজা-পদ্ধতি ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করতে পারে।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
সংস্কৃতায়ন শুধুমাত্র ধর্মীয় আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পোশাক, বিবাহ, সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
জাতিভিত্তিক সামাজিক গতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত
ভারতীয় জাতিভেদ ব্যবস্থার মধ্যে সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া হিসেবে সংস্কৃতায়নকে ব্যাখ্যা করা যায়। এটি দেখায় যে জাতিভিত্তিক সমাজেও কিছু মাত্রায় সামাজিক গতিশীলতা বা অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, সংস্কৃতায়ন ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা মূলত সামাজিক মর্যাদা, জাতিভেদ ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
তাই সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিম্ন বর্ণের মানুষদের উচ্চ বর্ণের অধিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তা সমাজ সহজে মেনে নেয় না। অনেক সময় সামাজিক স্বীকৃতি বা আইনগত স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। কিন্তু তা সত্বেও এর মাধ্যমে উচ্চ সামাজিক মর্যাদা বা সামাজিক স্বীকৃতি লাভ না হলেও সমাজের মানুষেরা কিছুটা উন্নত সংস্কৃতিক মর্যাদা লাভ করে থাকে।
| প্রাথমিক গোষ্ঠীর ধারণা, সংজ্ঞা, বৈশিষ্ঠ্য ও শিক্ষাগত তাৎপর্য | সামাজিক গোষ্ঠীর ধারণা, সংজ্ঞা ও শ্রেণীবিভাগ |
| শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবারের ভূমিকা | শিশুর সামাজিকীকরণে বিদ্যালয়ের ভূমিকা |
তথ্যসূত্র (Reference)
- Brown, F. J. (1954). Educational Sociology. New York: Prentice-Hall.
- Bhattacharjee, Srinivas. (1996). Philosophical & Sociological Foundation of Education. Herald Book Service.
- Das, P. (2007). Sociological Foundation of Education. New Delhi: Authorspress
- Shukla, S & K Kumar. (1985). Sociological Perspective in Education. New Delhi, Chanakya
Publications - Sodhi, T.S & Suri, Aruna. (1998). Philosophical & Sociological Foundations of Education, H.P Bhargav Book House, Agra,
- Sanskritization in Sociology
- PDF Study Materials
প্রশ্ন – সংস্কৃতায়ন শব্দটি কে প্রথম প্রবর্তন করেন
উত্তর – বিখ্যাত ভারতীয় সমাজতাত্ত্বিক অধ্যাপক এম. এন. শ্রীনিবাস সর্বপ্রথম সংস্কৃতায়ন শব্দটি প্রবর্তন করেন।
প্রশ্ন – সংস্কৃতায়নের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
উত্তর – সংস্কৃতায়নের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি বা উন্নত করার চেষ্টা।
আরোও পড়ুন
- পরিবার কাকে বলে | 5 টি সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য | Concept of Family
- যৌথ পরিবার ভাঙ্গনের কারণ | 8 Causes of Disintegration of Joint Family
- পরিবারের প্রকারভেদ বা শ্রেণিবিভাগ | 12 Types of Family in Sociology
- যৌথ পরিবার কাকে বলে | যৌথ পরিবারের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য | Definition and 10 Characteristics of Joint Family
- সমাজে পরিবারের ভূমিকা ও কার্যাবলী | 10 Function of Family in Sociology
- CU BA ভারতের সমাজবিজ্ঞান সাজেশন | CU BA Sociology of India Suggestion |CCF | Sem – 2 and 4





